top of page

ডিটেক্ট–ডিলিট–ডিপোর্টের ছায়ায় ভোটার তালিকা সংশোধন


গত ৪ঠা নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ভয় ও আশঙ্কার আবহাওয়া তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া ঘোষণার পর থেকে শুভেন্দু অধিকারী থেকে সুকান্ত মজুমদারের মত রাজ্যের বিজেপি নেতাদের হুমকিপূর্ণ আস্ফালন গরিব, খেটে খাওয়া, প্রান্তিক মানুষদের আরও আশঙ্কায় ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় যে কাগজ বা নথি নির্বাচন কমিশন চেয়েছে সেগুলির বেশিরভাগই গরিব, খেটে খাওয়া মানুষের কাছে নেই। ভারতবর্ষের যেকোনো প্রান্তে সরকারি নথি সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে থাকে না।

২০০২-এর এস আই আর-এর তালিকায় নাম আছে কিনা তার খোঁজ করতে গিয়ে, আজ থেকে ২৩ বছর আগের নির্বাচনী কেন্দ্রের নাম হাজারো তালিকার মধ্যে খুঁজতে নাজেহাল হয়েছেন সাধারণ মানুষ। প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার অনেক পরে এন্যুমেরেশন ফর্ম কীভাবে ভরা হবে তার নির্দেশিকা নিজেদের ওয়েবসাইটে আপলোড করে নির্বাচন কমিশন।

ভোটার কার্ড সংশোধন ও নতুন ভোটার কার্ড বানানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখে নির্বাচন কমিশন। ফলে যারা নতুন ভোটার বা যাদের ভোটার কার্ড আপডেটেড নয় তারা ফর্ম পাননি। অন্যদিকে ২০০২ সালের ভোটার লিস্টের তালিকায় পরিবারের কিছু সদস্যের বাবা বা মায়ের বা নিজেদের নাম আছে এবং কিছু সদস্যের নাম নেই—এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। অমিত শাহের “ডিটেক্ট–ডিলিট–ডিপোর্ট” হুমকির ভিত্তিতে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন অনেকেই।

প্রয়োজনীয় নথির বেশিরভাগই গরিব পরিবারে জন্মানো মেয়েদের নাগালের বাইরে। বিয়ের পর পদবী পরিবর্তন, বাবার বাড়ির নথি হাতে না থাকা, বা শ্বশুরবাড়ির অনীহা—সব মিলিয়ে মহিলাদের নথি জোগাড় করা কঠিন। প্রান্তিক লিঙ্গ–যৌন পরিচয়ের অধিকাংশ মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই তাঁদের নামে জন্ম শংসাপত্র, বাসিন্দার প্রমাণ বা সরকারি নথি সচরাচর থাকে না।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই হিন্দুত্ববাদী শক্তির মদতপুষ্ট মিডিয়ার একটি অংশ মুসলিম জনবসতি সম্পন্ন অঞ্চলগুলিকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে আক্রমণ করার নিকৃষ্টতম উদাহরণ দেখিয়েছে। এই অঞ্চলগুলিতে মূলত গৃহকর্মী, জনমজুর, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের বসবাস। বৈধ পরিচয়পত্র, নথি, জমির দলিল থাকা সত্ত্বেও বিজেপি–আরএসএসের বহিরাগত তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে এই দেশের নাগরিকদের উপর বাংলাদেশি তকমা লাগানোর এই নির্লজ্জ ষড়যন্ত্র এলাকাবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়ে।

ঘরে ঘরে BLO-দের মাধ্যমে ফর্ম ফিলআপের প্রক্রিয়া শেষ হয় ৪ঠা ডিসেম্বর। প্রায় ১০ কোটি মানুষের বসবাসকারী পশ্চিমবঙ্গে ৮০,০০০ জন সরকারি কর্মচারীকে বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করে (শিক্ষক, সহ-শিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ইত্যাদি), তাঁদের কর্মদিবসের বাইরে কাজ করিয়ে অমানবিক চাপ তৈরি করে এই ফর্ম বিতরণ ও ফিলআপের কাজ সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। এর ফলস্রুতিতে ২ জন BLO আত্মহত্যা করেছেন এবং ১ জন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে মারা গেছেন। রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় BLO–রা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া এবং পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এই BLO–দের এক অসম্ভব কাজ করার জন্য ঠেলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

Comments


bottom of page